নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৬ বিকাল ০৩:৫৭:৫১
কমছে নিত্যপণ্যের দাম, বাড়ছে করমুক্ত আয়ের সীমা
মুদ্রাস্ফীতির চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষের জন্য বড় সুখবর নিয়ে এল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট পেশ করছেন। এই বাজেটে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ কমাতে এবং হাতে বাড়তি টাকা রাখতে একগুচ্ছ জনমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর ঘোষণা সবার নজর কেড়েছে।করমুক্ত আয়ের সীমায় বড় ছাড় মধ্যবিত্তের জন্য বাজেটের সবচেয়ে বড় উপহার হলো করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি। বর্তমানে বছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর কোনো কর দিতে হয় না। অর্থমন্ত্রী এটি বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেছেন। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের পকেটে এখন থেকে বাড়তি টাকা জমা থাকবে।নারীদের জন্য এই সুবিধা আরও বেশি। নারী করদাতা এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সি নাগরিকদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা হবে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী করদাতাদের জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর কোনো কর দিতে হবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আহত যোদ্ধাদের জন্যও থাকছে বিশেষ কর সুবিধা।
চাল-ডালসহ ৬০ পণ্যের দাম কমবে বাজারে নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের জন্য বড় কর ছাড় দিয়েছে। চাল, ডাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল, চিনি ও লবণের মতো ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎস কর কমানো হয়েছে। আগে এসব পণ্যের ওপর উৎস কর ছিল ২ থেকে ৫ শতাংশ। এখন তা এক ধাক্কায় কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে বাজারে এসব পণ্যের দাম দ্রুতই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চিকিৎসা খরচ কমানোর উদ্যোগ সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খরচ সাশ্রয় করতে বাজেটে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে সব ধরনের কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিবার ডায়ালাইসিসের খরচ প্রায় ৮০০ টাকা কমবে। এছাড়া হার্টের রিংয়ের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং চোখের লেন্সের দাম ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমানোর জন্য কর ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট এখন আরও সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে এবং সাধারণের খরচ কমাতে মোবাইল ফোনের সিম কার্ডের ওপর থাকা ৩০০ টাকা ট্যাক্স পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে নতুন সিম কেনা আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার ওপর থাকা উৎস কর ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচও কিছুটা কমবে।
প্রবীণদের জন্য ট্রেনের টিকিট ফ্রি জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সম্মান জানাতে অর্থমন্ত্রী একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন। এখন থেকে ৬৫ বছরের বেশি বয়সি নাগরিকরা সারা দেশে ট্রেনে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ভ্রমণ করতে পারবেন। এছাড়া মেট্রোরেলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে তারা ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড় পাবেন। এটি দেশের প্রবীণ নাগরিকদের যাতায়াত সহজ ও আনন্দদায়ক করবে।
ফ্যামিলি কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে ৪১ লাখ নারীকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে কার্ডধারী নারী মাসে ২,৫০০ টাকা করে নগদ ভাতা পাবেন। এছাড়া প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে মাসে ১,০০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৩৮ লাখ মানুষ এই ভাতার সুবিধা পাবেন।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। মূল্যস্ফীতির কথা মাথায় রেখেই তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রধান লক্ষ্য বাজারে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে আমরা একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়তে চাই।
‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’- প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের বিশাল এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক-দুই উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার অর্থ সংগ্রহ করা হবে। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করা হবে। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট। এছাড়া বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি আমির খসরুর প্রথম বাজেট উপস্থাপন। নিয়ম অনুযায়ী, সংসদে উপস্থাপনের আগে বাজেটটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয় এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এতে সম্মতি জানান। ১ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে নতুন এই অর্থবছর।