ঢাকা টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬ রাত ১২:৪৯:২৯
সিলেটে বিউটি পালের পাশে শিক্ষক-লেখক ও সাংবাদিকরা
সিলেটে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার গানের ভিডিও নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পক্ষে বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন নেটিজেনরা।
ভিডিওতে অশ্লীলতা ও আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গির অভিযোগ তুলে একটি পক্ষ। সচেতন মহল নামে ওই পক্ষ আলোচনার সূত্রপাত করলেও সারাদেশের শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক এবার দাঁড়িয়েছেন ওই শিক্ষকের পাশে।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি পাল বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুরের দিকে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে কয়েক সেকেন্ডের একটি রিল ভিডিও পোস্ট করেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শাড়ি পরা অবস্থায়য় হাঁটছেন প্রধান শিক্ষিকা বিউটি পাল। ভিডিওতে ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে/ দূর অজানায় চায় হারাতে’ গানটি ব্যবহার করা হয়েছে।
ভিডিওটি প্রকাশের পর কথিত সাংবাদিক ও সচেতন মহল তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। তারা সামাজিক যোগাযোগ ও সংবাদ মাধ্যমে ভিডিও প্রচার নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। তবে, সময় নেননি তার পক্ষের লোকজনও।
শিশু সাহিত্যিক হুমায়ুন কবীর ঢালী লেখেন, ‘একজন শিক্ষকও রক্ত-মাংসের মানুষ। তারও আনন্দ উদযাপন করার অধিকার আছে, তেমনি কষ্টে মন খারাপ হওয়ার অধিকারও তার রয়েছে। শিক্ষক মানেই কোনো নিরাসক্ত যন্ত্র নন, সমাজ ও পরিস্থিতির প্রভাবে তার মনেও নানা অনুভূতির জন্ম হয়।’
তিনি লেখেন, ‘যা অশ্লীল, তা শুধু শিক্ষকের ক্ষেত্রে নয়; সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও অশ্লীল। একইভাবে, যা শ্লীল, মার্জিত ও সুন্দর তা নির্দিষ্ট কোনো পেশার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সকলের জন্য প্রযোজ্য। শিক্ষক সমাজের পথপ্রদর্শক হলেও দিনশেষে তিনিও সমাজেরই একজন মানুষ।’
সাংবাদিক ঝর্না মনি লেখেন, ‘বিউটি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ওরা ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে। আমরা এক সাথে বড় হয়েছি। আমাদের বাড়ির পুকুরে একসাথে সাঁতার কাটতাম। সন্ধ্যাবেলায় ওদের অংক শেখাতাম। চুল বেনি করে দিতাম। একসাথে গান গাইতাম। ধামাইল নাচ করতাম।’
আমরা স্কুলের প্রতিটি অনুষ্ঠানে বিজয় দিবসই হোক, ‘আর একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসই হোক নাচ, গান, আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা হতোই।’
দিপা মন্ডল নামে একজন শিক্ষক লেখেন, ‘শিক্ষকদের নাকি নাচ গানে অভিনয়ে পারদর্শী হতে হয়। তবে আজ কেন এত কথা ? যন্ত্রের মতো শুধু শ্রেণিতে সব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের সাথে ক্লাসে পাঠে মনোযোগী করতে, একঘেয়েমি দূর করতে, পাঠে আনন্দের সাথে উপস্থাপন করতে শিক্ষককে সব করতে হবে। আর সেই শিক্ষকের কোন মন থাকবে না, থাকবেনা কোন আনন্দের মুহূর্ত এটাই তো? একজন সম্মানিত শিক্ষক শাড়ি পরিহিত অবস্থায় কি করে অশ্লীলতা প্রকাশ করতে পারে? সে তো প্যান্ট শার্ট বা টপস পরিহিত ছিলেন না। তবে হোক প্রতিবাদ।’
তন্দ্রা তনু নামে একজন শিক্ষক লেখেন, ‘কেউ কেউ বোধহয় এখনো মনে করেন, প্রাথমিকের শিক্ষক মানেই ছেঁড়াফাটা কাপড়, ক্লান্ত মুখ আর অভাবের প্রতীক! তাই যখন কোনো প্রাথমিক শিক্ষক বা শিক্ষিকা পরিচ্ছন্ন পোশাকে, হাসিমুখে, আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়ান তখন তাদের সহ্য হয় না। মনে হয়, শিক্ষক হাসবে কেন ? ভালো থাকবে কেন? দুঃখিত, সময় বদলেছে।’
এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক বিউটি পাল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। মানুষের ব্যক্তিগত লাইফ থাকতে পারে না? একজন শিক্ষক যখন একটি জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন, তখন নিশ্চয়ই ধরে নিতে হয় তিনি তার যোগ্যতা, দক্ষতা, নিষ্ঠা ও কর্মের মাধ্যমে এই সম্মান অর্জন করেছেন। তিনি একজন শিক্ষক, কিন্তু তার আগে তিনি একজন মানুষ, একজন নারী। তারও একটি মন আছে, আনন্দ আছে, ভালো লাগা আছে, নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে।’
উল্লেখ্য, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি পাল সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।