ঢাকা টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ : ৯ মে ২০২৬ দুপুর ০১:১০:১৬
বজ্রপাতের মৌসুম মে-জুন মাস, ঝুঁকি এড়াতে করণীয়
দেশে বজ্রপাত শুরুর সময় ধরা হয় এপ্রিল-মে মাসকে। আর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাত থাকলেও শুরুর তিন মাসকে ‘পিক টাইম’ হিসেবে গণ্য করেন বিশেষজ্ঞরা। এবার এপ্রিল থেকেই বজ্রপাতের ভয়ংকর রূপ দেখা যাচ্ছে।বজ্রঝড় বা বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের শুরুটা হয় বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে। বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময় দিনের দৈর্ঘ্য বড়ো হয়। বেশি মাত্রায় সূর্যের তাপ ভূপৃষ্ঠে পড়ায় পৃথিবীপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয়। উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে বায়ুতে। উষ্ণ, আর্দ্র বায়ুর ঘনত্ব ঠান্ডা বাতাসের চেয়ে বেশি হওয়ায় দ্রুত ওপরে উঠে যায়। ঠান্ডা, শুষ্ক বাতাস পড়ে থাকে নিচে। ওপরে ওঠার সময় বাতাসের জলীয় বাষ্প ধীরে ধীরে আরও ঠান্ডা হয়ে পরিণত হয় পানির ফোঁটায়। তৈরি হয় মেঘ। এই পানির কণা সমৃদ্ধ বাতাস দ্রুত তাপ ছাড়তে থাকে চারপাশে। ফলে মেঘ ওপরে উঠতে থাকে। মেঘের আশপাশের অংশে শক্তিশালী ও ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ তৈরি হয়। এর প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয় বিশাল বজ্রমেঘ। মেঘের মধ্যে যত বেশি জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়, ততই পানির ফোঁটাগুলো একটি আরেকটার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বড়ো হতে থাকে। ওপরের অংশে তাপমাত্রা কম হওয়ায় সেখানে পানি আরও শীতল হয়। ফলে জমতে থাকে বরফ কণা। বায়ুপ্রবাহের কারণে মেঘের অজস্র পানির কণা বরফের কণাগুলোর সঙ্গে ক্রমাগত ঘষা খেতে থাকে। মেঘের ঋণাত্মক চার্জ ভূ-পৃষ্ঠের ইলেকট্রনকেও আন্দোলিত করে।
বিশেষজ্ঞদের মত
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে বজ্রপাত সম্পর্কিত গবেষণা বলছে, বিশ্বের সর্বত্র বজ্রপাত সমহারে বাড়ছে না। সম্প্রতি স্যাটেলাইট উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, আঞ্চলিক ক্ষেত্রে বজ্রপাতের ওপর জলবায়ু উষ্ণায়নের প্রভাব সুস্পষ্ট, অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী না বাড়লেও দক্ষিণ এশিয়া বা ক্রান্তীয় অঞ্চলের অনেক দেশে বজ্রপাতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। সুতরাং সামনের দিনে মানুষ ও সম্পদের ঝুঁকি আরও বাড়বে। বজ্রপাত গবেষকদের অভিমত, দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশগুলোয় বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি, তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও। মার্চ, এপ্রিল, মে— এই তিন মাসে দেশে একাধিকবার বৃষ্টিসহ ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত হয়। বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটে মে থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এ সময়ে বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রতি বছর গড়ে ৭ লাখ ৮৬ হাজার বজ্রপাত হয়ে থাকে, যার একাংশ মাটি পর্যন্ত আসে। চলতি মৌসুমে তাপপ্রবাহ বেশি হওয়ায় বজ্রপাতের পরিমাণ বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই সচেতন হওয়া জরুরি। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন মাসে বজ্রপাত বেশি হয়। এই সময়ে আকাশে মেঘ দেখা গেলে ঘরে অবস্থান করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব ভবন বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। মাঠে বা বাইরে থাকলে আকাশে মেঘ দেখা দেওয়া মাত্র ঘরে ফিরে আসতে হবে। বজ্রপাতের সময় বাসাবাড়িতে যে-সব ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি (ফ্রিজ, টিভি, এসি, ওভেন, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি) আছে, সেগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ সাময়িক বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। এতে বজ্রপাতে ক্ষতির আশঙ্কা কমে যায়। বজ্রপাতের সময় মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করতে হবে। কৃষিকাজ বন্ধ করে ঘরে ফিরে আসতে হবে বা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। প্রাকৃতিক উপায়ে বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য বেশি করে তালগাছ রোপণ করতে হবে। তালগাছ বজ্রপাত নিরোধক। যে-সব তালগাছ বড়ো হয়েছে, সেগুলো কাটা যাবে না, যত্ন করতে হবে। তালের বীজ থেকে চারা গাছ হওয়ার পর সেগুলো বড়ো হওয়ার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার জন্য আমাদের সবারই উচিত নির্দেশনাগুলো মেনে চলা। বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় সচেতনতা তৈরিতে প্রশাসনিকভাবে কর্মসূচি নিতে হবে। বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা নিলে আশা করা যায়, মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসবে। বজ্রপাত বা বজ্রঝড়ের সময় যদি বাইরে থাকেন, তবে ঝুঁকি এড়াতে নিচের বিষয়গুলো পালন করা বাধ্যতামূলক। উঁচু স্থান অবশ্যই এড়াতে হবে বা নদী, পুকুর, খাল-বিল ইত্যাদির আশপাশে থাকা যাবে না। কোনো অবস্থাতেই ভূমিতে শোবেন না বা বিচ্ছিন্ন কোনো বড়ো গাছের নিচে দাঁড়াবেন না। বৈদ্যুতিক তারের বেড়া, ধাতব পদার্থ বা সংশ্লিষ্ট বস্তু (টাওয়ার) থেকে দূরে থাকুন। কেননা, ধাতব পদার্থের মাধ্যমে বজ্রপাত অনেক দূর পর্যন্ত চলাচল করতে পারে। পুকুর, নদী-নালা বা হ্রদে মাছ ধরা বা নৌকা ভ্রমণ যে কোনো উপায়ে পরিহার করতে হবে। অনেক মানুষ একসঙ্গে থাকলে (যেমন খেলার মাঠে) ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যেতে হবে। বজ্রঝড়ের সময় মানুষ জড়ো অবস্থায় থাকলে অনেকজনের একসঙ্গে প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে।